অধ্যায় ১১০【ছয়জনের আবাসিক কক্ষ】

রাজ্যের দীর্ঘজীবন হোক গভীর বিস্ফোরক 2391শব্দ 2026-03-24 15:16:02

এই পৃথিবী এক অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

ম্লান রাতের অন্ধকারে বিশাল ভবনটি যেন ঘুমিয়ে থাকা এক পাথুরে দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। গাবা গোত্রের যোদ্ধা ট্যামি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ভবনটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, এটি হয়তো নাইলং পাহাড়ের সবচেয়ে ছোট চূড়াটির সমান উঁচু। করিডোরের মাঝখানে ঝুলে থাকা হলদেটে তেলের বাতিগুলো যেন এই দানবের চোখে ফুটে থাকা মণি, যা রাতের প্রতিটি কোণ ও পথকে আলোকিত করে রেখেছে।

এটিই নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের বাসস্থান।

ট্যামির উচ্চতা দুই মিটার দশ সেন্টিমিটার। তার পিঠে ঝোলানো বেতের ঝুড়িটি দেখে মনে হচ্ছে কোনো পূর্ণবয়স্ক মানুষ ছোট কোনো শিক্ষার্থীর ব্যাগ বয়ে বেড়াচ্ছে। ঝুড়ির ভেতরে রয়েছে মিহি কাপড় আর চামড়ার বর্ম। সেই বাচাল ও নিষ্ঠুর এলফ দূত বলেছিল, আগামীকাল তাদের ‘জাতীয় কোষাগার’ নামক জায়গা থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করতে হবে। বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর। ট্যামি মনের গহীন থেকে এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করল, যেন সে নতুন কোনো পৃথিবীতে এসে পড়েছে।

‘সিরিয়াল নম্বর ৩৩৩, ডরমিটরি রুম: ২৩৩’। সে হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখা ছোট কাঠের ফলকটির দিকে তাকাল। যদিও জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত সে কখনো এই ধরনের চিহ্ন দেখেনি, তবুও ট্যামি এর অর্থ বুঝতে পারছিল। যেন এটি কোনো বিশেষ সহজাত ক্ষমতা। ফলকের প্রথম দিকের চিহ্নগুলো সম্ভবত কোনো পরিচয় বহন করছে, আর পরেরগুলো তার ভবিষ্যৎ আবাসস্থল নির্দেশ করছে।

কিছুক্ষণ পর, তার দৃঢ় ও অভিজ্ঞ মুখাবয়বে এক গভীর মনোযোগের ছাপ ফুটে উঠল। ট্যামি সাহস সঞ্চয় করে সতর্ক পদক্ষেপে সেই বিশাল পাথরের ভবনের দিকে এগিয়ে গেল। প্রতিটি কদম ফেলার সময় সে চারপাশটা ভালো করে দেখে নিচ্ছিল। শক্ত পাথরের সিঁড়ি বেয়ে সে দ্বিতীয় তলায় উঠে এল।

“হাঁপ... হাঁপ...” ট্যামির মুখমণ্ডল লাল হয়ে উঠেছে, সে কাঁপছে আর হাঁপাচ্ছে। এত অসহায় বোধ সে অনেকদিন করেনি। এই ভবনটি তার মনে যে দমবন্ধ করা চাপের সৃষ্টি করেছে, তাতে মনে হচ্ছিল সে এখন কোনো বিশাল দানবের ক্ষুধার্ত মুখের ভেতরে আছে, যে কোনো মুহূর্তে সে গ্রাস হয়ে যেতে পারে।

ভয়ঙ্কর... ভারী...

এই মুহূর্তে যদি কোনো কিছু তার কাছে এগিয়ে আসত, তবে ট্যামি নিজেকে সামলাতে না পেরে সরাসরি আক্রমণ করে বসত। যখন সে হৃদকম্পন বাড়িয়ে দেওয়া এক অসহায়ত্ব অনুভব করছিল, তখনই হঠাৎ এক প্রাণবন্ত আওয়াজ ভেসে এল, “এই যে, তুমি কি নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত যোদ্ধা?”

এখানে সত্যিই কেউ আছে...

ট্যামির সারা শরীর কেঁপে উঠল। তার চোখে ফুটে উঠল রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা কোনো হিংস্র পশুর মতো উজ্জ্বল দৃষ্টি। সে করিডোর দিয়ে এগিয়ে আসা লোকটির দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাল। লোকটির গঠন দেখে মনে হচ্ছে সে সদ্য জন্ম নেওয়া কোনো নেকড়ে ছানা, তার চুল পাতলা ও হলদেটে। তার চোখেমুখে ফুটে আছে এক ধরনের সরলতা। সে হলো হার্যা, যে খুব অল্প কিছুদিন আগে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের দলে যোগ দিয়েছে।

“...” ট্যামি কিছু বলতে গিয়ে জিভ আড়ষ্ট বোধ করল। সে তার শিরা ফুলে ওঠা হাত দুটিকে শান্ত করে মৃদু মাথা নাড়ল।

“আমার নাম হার্যা, তোমার মতোই আমিও নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের একজন।” কিশোরটি তার খসড়া হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে এক নির্মল ও বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি দিল। এই কদিনে সে অনেক বন্ধু বানিয়েছে এবং অনেক ‘নতুন’ শিষ্টাচারও শিখেছে।

“আমি... ট্যামি।” ট্যামি ফ্যাকাশে মুখে উত্তর দিল। অস্বস্তির কারণে সে তার পা দিয়ে শক্ত করে মাটি চেপে ধরে ছিল, কিন্তু এই অবস্থা বেশিক্ষণ ধরে রাখা কঠিন।

“তুমি কি ২৩৩ নম্বর রুমের? বাহ... পরমেশ্বর সহায়! আমরা তো প্রতিবেশী!” হার্যা তার হাতের পরিচয়পত্রের নম্বর দেখে সাথে সাথে খুশিতে হেসে উঠল। “তোমার চেহারা তো খুব একটা ভালো দেখাচ্ছে না। এসো, আমি তোমাকে বিশ্রাম নিতে নিয়ে যাই।”

হার্যার পেছনে পেছনে গিয়ে ট্যামি একটি প্রশস্ত ঘরে প্রবেশ করল। ভেতরে যা দেখল তাতে সে অবাক না হয়ে পারল না। সেখানে কাঠের তৈরি তক্তা আর অদ্ভুত সব জিনিসপত্র রয়েছে। যেমন—কাঠের খুঁটির ওপর বসানো তক্তা, যার ওপর বিছানো আছে পশুর চামড়া ও লতাগুল্ম। ঘরে ইতিমধ্যে আরও পাঁচজন গোত্রীয় মানুষ ছিল, যাদের দিনের বেলা হয়তো সে দেখেছিল।

এই জায়গাটিতে কি ছয়জন মিলে থাকে?

‘এটা... অনেক বড়।’ ট্যামি কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করল। সে ভেবেছিল রাতে তাকে হয়তো অনেকের সাথে মেঝেতে শুতে হবে, আর দিনে প্রভুর জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। লাল শহরটি যেন তার ধারণার চেয়ে পুরোপুরি আলাদা।

“ইনি তোমাদের নতুন রুমমেট। প্রভুর আদেশ হলো নতুনদের যত্ন নেওয়া, নাহলে আমি জানতে পারলে মহান এলফ দূতকে সব বলে দেব...” হার্যা বয়সে ছোট হলেও অন্যদের দেখাশোনা করার ক্ষেত্রে বেশ কঠোর। যদিও ঘরের বাকিরা তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, তবুও সে বিন্দুমাত্র ভয় পায়নি। কারণ, লাল শহরে কোনো সঙ্গীকে আঘাত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, অন্যথায় কঠিন শাস্তি পেতে হয়।

ট্যামি যখন কিছুটা দিশেহারা বোধ করছিল, তখন হঠাৎ তার কানে একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। আওয়াজটি আসছিল কোণের দিকের একটি উঁচু বিছানা থেকে:

“ট্যামি, তুমি... তুমি এখানে কীভাবে এলে?”

ট্যামি দ্রুত সেদিকে তাকাল এবং তার মুখে ফুটে উঠল বিস্ময় ও আনন্দের আভা। “উ... উসোপ?”

দেখা গেল, উঁচু বিছানা থেকে এক কালো ও হলদেটে চামড়ার কোঁকড়ানো চুলের মানুষ লাফিয়ে নিচে নেমে এসেছে। তার চেহারা সাধারণ হলেও নাকটি বেশ লম্বা। গোলাকার চোখে একই রকম উত্তেজনার হাসি। সে স্থির পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে এল। “ভাবতেই পারিনি, আমাদের গাবা গোত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধা লাল শহরে চলে আসবে!”

সত্যিই... সত্যিই সে!

“তুমি এখানে কীভাবে এলে? আমি ভেবেছিলাম তুমি আর ওরা সবাই...” ট্যামি আবেগ সামলাতে না পেরে তার গোত্রীয় ভাইকে জড়িয়ে ধরল। দিনের বেলা ভিড়ের কারণে সে তার উপস্থিতি লক্ষ করেনি।

“হ্যাঁ, তখন আমি আর গ্যাসি...” উসোপের কণ্ঠস্বরে সবসময় এক ধরনের কৌতুকপূর্ণ ভঙ্গি থাকে। কথা বলার সময় তার ঠোঁটের কোণ সামান্য বাঁকা হয়ে যায়। সে তখন পশু আক্রমণের সেই ঘটনা এবং দ্বীপে পালিয়ে বেড়ানোর দুঃখজনক কাহিনী বলতে শুরু করল।

ট্যামি মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনল। উসোপ ছোটবেলা থেকেই তার ভাইয়ের মতো। এই অচেনা জায়গায় নিজের গোত্রের কাউকে ফিরে পাওয়া ছিল সবচেয়ে বড় পাওয়া। গাবা গোত্র দ্বীপের উত্তর-মধ্যভাগে অবস্থিত হওয়ায় পশু আক্রমণের সময় ঠিক বিপদের মুখেই পড়েছিল তারা। অনেকেই সাথে সাথে প্রাণ হারিয়েছিল। ট্যামি গোত্রপতির শেষ ইচ্ছানুযায়ী নারী ও শিশুদের নিয়ে পালিয়েছিল। কিন্তু দ্বীপে শুধু পশু আর নরখাদকদের ভয়ই ছিল না, তাদের দলটি বারবার নানা ধরনের দানব ও অশুভ শক্তির আক্রমণের মুখে পড়েছিল। দ্বীপের মাঝখান দিয়ে আসার সময় যখন শুনল তাদের গোত্র ধ্বংস হয়ে গেছে এবং পশুরা তা দখল করে নিয়েছে, তখন উপায়ান্তর না দেখে অন্য শরণার্থীদের অনুসরণ করে তারা এই কিংবদন্তির স্বর্গের দেশ ‘লাল শহর’-এ চলে আসে।

শুধু গাবা গোত্র নয়, ছোট-বড় অনেক গোত্রের ভাগ্যই এমন ছিল। এইবারের পশু আক্রমণ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ, যা তাদের বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিয়েছিল। ঘরবাড়ি হারিয়ে, দিশেহারা হয়ে তারা শেষ পর্যন্ত এখানে এসে জড়ো হয়েছে।

নতুন ইতিহাস যেন অজান্তেই লেখা শুরু হলো।

দেশের মানুষ দেশের মানুষকে দেখে চোখের জল ফেলল। তারা দুজনে দাঁড়িয়েই স্মৃতিচারণ শুরু করল। এতে ডরমিটরির অন্য গোত্রীয় মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষিত হলো। তারা মাথা তুলে মৃদু হাসল এবং তাদের কথা শুনতে লাগল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হার্যা দেখল, এই মুহূর্তে তাদের বিরক্ত করা ঠিক হবে না। সে এক চিলতে ম্লান হাসি হেসে নিঃশব্দে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।

সেও মনে মনে স্বপ্ন দেখল, কবে তার জীবনেও এমন কোনো আপন মানুষ ফিরে আসবে।